‘আপনি যাবেন কতদূর?’
‘আমি নিগণ স্টেশনে নেমে যাব।’
‘তাহলে তো কথাই নেই। উনিও নিগণে নামবেন। ওঁকে নিয়ে যাবার জন্যে গরুর গাড়ি অপেক্ষা করবে ওখানে।’
আশস্ত হয়ে দুই যুবক ট্রেন থেকে নেমে গেল। ট্রেন এখন চলতে শুরু
করেছে। প্ল্যাটফর্মের ওপর চলন্ত ট্রেনের কামরাগুলোর ছায়া চলতে চলতে একসময়
মিলিয়ে গেল। প্ল্যাটফর্ম পেরোনোর পরও ট্রেন ধীর লয়ে চলছে। কিছু দূর এগিয়ে
সামনে একটা ব্রিজ এল, পার হবার সময় কানে বাজল ধাতব গুমগুম আওয়াজ। কিন্তু
ট্রেনের গতি যে একটুও বাড়ছে না—দুপাশে বর্ধমান শহরের ল্যাম্পপোস্টগুলোর
ম্লান আলো টিমটিম করে জ্বলছে। দুপাশের রেল কোয়ার্টার খুব ধীরে ধীরে পেছনে
পড়ে যাচ্ছে। আর একটুক্ষণের মধ্যেই দুপাশে রাঢ়ের বিস্তৃত মাঠ পেছনে সরে যেতে
থাকবে ক্রমশ। প্রান্তরের মধ্যে অন্ধকার আস্তে আস্তে অভ্যস্ত চোখে ফিকে
দেখাবে। দূরদূরান্তের গ্রামগুলো এর মধ্যেই মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ সুষুপ্ত।
নির্জনতা যেন শরীরী রূপ নিয়ে আলোজ্বলা কামরার ভেতরটিকেও
অন্ধকারের বেশ দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। যদিও, কামরার দুই দিকে দুটি পুরোনো আলো
জ্বলছে, তাতে ভুতুড়েই মনে হচ্ছে সব কিছু। কামরার ল্যাজা-মুড়ো দুদিকেই মাথার
ওপরে লেখা আছে ‘বারোজন বসিবেক। বিনা টিকিটে ওঠা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ’।
কথাগুলোর তলে একদল কাঠপিঁপড়ে লাইন ধরে যাচ্ছে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় সদ্য
কিশোরের রোঁয়া ওঠা গোঁফ—নিয়মকে পিঁপড়েগুলো ব্যাঙ্গই করছে হয়তো। আর দেখা
যাচ্ছে তার পাশে আরও বড় বড় হরফে লেখা ‘বাংলার শত্রু ম্যালেরিয়া’। এর নিচে
আবার ছোট হরফে টীকা হিসেবে সংযোজন, ‘মশা জন্মাতে দেবেন না। পুকুর পরিষ্কার
রাখুন। মাছ ছাড়ুন।’ সাথে একটা পুকুরের ছবি, নেহাতই কাঁচা হাতে আঁকা।
এমন সময়. হঠাৎই সম্মুখে থাকা তরুণীর মুখশ্রীর দিকে চোখ পড়ল।
দুজনেই এই আকস্মিক আবিষ্কারের ঘটনায় বিব্রত। যেনবা এ না হলেই ভালো ছিল,
কিন্তু এখন তো একে এড়ানোর উপায়ও নেই। কে আগে কথা বলবে বা শুরু করবে সংলাপ?
দুজনেই তো দুজনকে চেনে!
Comments
Post a Comment
thank you for your comments